Mujahidul Islam Sir Exam Topic

 (Q:1) ব্রিটিশ সংবিধানের উদ্ভব ও বিকাশ  

Answer:

ভূমিকা : বিরাট রাজনৈতিক পরিবর্তন বা কোনো এক সময়ে সংঘটিত রাষ্ট্র বিপ্লবের ফলে ব্রিটিশ শাসনতন্ত্র নতুনভাবে রচিত হয়নি বরং ইংরেজ জাতির উদ্ভবের প্রথম থেকেই তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্রমবিকাশের সাথে সাথে ব্রিটিশ শাসনতন্ত্র গঠিত ও বিবর্তিত হয়েছে এবং বর্তমান কালেও বিবর্তিত হচ্ছে। আধুনিক বিশ্বের প্রাচীনতম সংবিধান হিসেবে পরিচিত ব্রিটিশ। সংবিধানের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, কোনো নির্দিষ্ট গণপরিষদ কর্তৃক ব্রিটিশ সংবিধান রচিত হয়নি বরং এটি এক দীর্ঘ, ধীর, অব্যাহত ও প্রধানত  ক্রমবিবর্তনের ফল।

ব্রিটিশ শাসনতন্ত্রের উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ : পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সংবিধানের উদ্ভবের ইতিহাস এবং ব্রিটেনের শাসনতন্ত্রের উদ্ভবের ইতিহাস এক নয়। ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থা হল দীর্ঘদিনের ক্রমবিবর্তনের ফল এবং এর বিবর্তনধারা আজও অব্যাহত। অধ্যাপক ফাইনার এটিকে "A constitution of never ending evolution" বলে অভিহিত করেছেন। ইংরেজ জাতির উদ্ভবের পরবর্তী পর্যায়ে বিভিন্ন রকম সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিবর্তনের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনতন্ত্র গড়ে উঠেছে। নিম্নে ব্রিটিশ শাসনতন্ত্রের উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :

১. অ্যাংলো স্যাক্সন যুগ : অ্যাংলো স্যাক্সন উপজাতীয় লোকেরা ইউরোপীয় ভূখণ্ড থেকে পঞ্চম শতাব্দিতে ইংল্যান্ডে আসে এবং সেমেটিক উপজাতীয়দের বিতাড়িত করে সেখানে বসতি স্থাপন করে। এ যুগেই ব্রিটেনের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসের দুটি মৌলিক সংস্থা ‘রাজতন্ত্র' ও ‘সংসদীয় ব্যবস্থার সূত্রপাত ঘটে।


২. রাজতন্ত্রের উদ্ভব : তৎকালীন ব্রিটেনের সাসেক্স, অ্যাসেক্স, ওয়াসেক্স, পূর্ব অ্যাঙ্গোলিয়া, মর্সিয়া, নদাম্বিয়া ও কেট বি এ রাজ্যগুলোর মধ্যে ওয়াসেক্স রাজ্যপ্রধান অন্যান্য রাজ্যগুলোর R উপর সার্বভৌম কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে অ্যাংলো স্যাক্সন যুগে ব্রিটেনে রা রাজতন্ত্রের সূত্রপাত ঘটায় ।


 ৩. উইটান : অ্যাংলো স্যাক্সন যুগে উত্তরাধিকারসূত্রে  রাজপদে আসীন রাজারা উইটান বা উইটেন গেমট পরিষদের শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। গুরুত্বপূর্ণ  কার্যসম্পাদনের ক্ষেত্রে উইটানের পরামর্শ গ্রহণ করা রাজার পক্ষে  বাধ্যতামূলক না থাকলে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের যুগে এ পরামর্শ পরিষদের উদ্ভব শাসনতান্ত্রিক দিক থেকে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল। 


৪. নর্মান যুগ : ১০৬৬ সালে নর্মান্ডির উইলিয়াম ইংল্যান্ড জয়  করলে ব্রিটিশ শাসনতন্ত্রের ক্রমবিকাশের দ্বিতীয় পর্যায়ের সূত্রপাত ঘটে। সামন্তরাষ্ট্র ও রাজার সর্বসময় কর্তৃত্ব নর্মান যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্য।


৫. বৃহত্তর পরিষদ : উইলিয়ামের সময় থেকেই নর্মান দৃষ্ট রাজারা রাজ পরিবারের প্রধান কর্মচারী আর্চ বিশপ, বিশপ, আল স্ত্রর অ্যাবট ও নাইটদের নিয়ে গঠিত বৃহত্তর পরিষদের মাধ্যমে ক্তি বিচারকার্য, আইন প্রণয়ন, করধার্য প্রভৃতি কার্যসম্পাদন করতো এবং ওয়েস্টমিনিস্টারে এর অধিবেশন বসত।


৬. ক্ষুদ্রতর পরিষদ : অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে রাজাকে সর্বদা সাহায্য করার জন্য ক্ষুদ্রতর পরিষদ গঠিত হয়। এ পরিষদ দীর্ঘস্থায়ী না হওয়ায় দ্বিতীয় হেনরির রাজত্বকালে এটি ভেঙে দ্রা দেওয়া হয় এবং প্রিভিকাউন্সিল' নামে একটি কার্যকরী সংস্থা গঠন করা হয়।


৭. বিচার বিভাগ ও শাসন বিভাগের স্বতন্ত্রীকরণ: বারো শতকে দ্বিতীয় হেনরির রাজত্বকালে সর্বপ্রথম বিচার বিভাগ হতে শাসন বিভাগকে স্বতন্ত্রীকরণ বা পৃথক করা হয়।


১১. গোলাপের যুদ্ধ : ১৪৫৫-৮৫ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ইয়র্কগণ ও ল্যাঙ্কাস্টারদের মধ্যে সংঘটিত গোলাপের যুদ্ধে প্রাচীন না সামন্ত বংশগুলো ধ্বংস হয়ে ইংল্যান্ডে টিউডর বংশের -র স্বৈরশাসনের সূত্রপাত ঘটে।


১২. টিউডর যুগ ও চরম রাজতন্ত্র : টিউডর যুগে চরম রাজতন্ত্রের ধারক রাজা হেনরি, অষ্টম হেনরি এবং প্রথম এলিজাবেথের রাজত্বকালে পার্লামেন্ট বিশেষভাবে রাজা ও রানির অনুগত হয়ে পড়ে। টিউডরদের সময়ই পার্লামেন্টের উভয় কক্ষ নিজেদের প্রাত্যহিক কাজের বিবরণ লিপিবদ্ধ করতে আরম্ভ করে।


১৩. স্টুয়ার্ট যুগ : সপ্তদশ শতাব্দতে স্টুয়ার্ট বংশের প্রথম রাজা প্রথম জেমস সাধারণ আইন বা পার্লামেন্টের বিরোধিতা করে রাজার 'Theory of Divine Right তুলে ধরলে স্টুয়ার্ট রাজাদের সাথে পার্লামেন্টের বিরোধ অনিবার্য হয়ে পড়ে।


১৪. অধিকারের আবেদনপত্র : ১৬২৮ সালে প্রথম চার্লসের রাজত্বকালেই পার্লামেন্টের উভয় কক্ষ একযোগে স্টুয়ার্ট রাজাদের স্বৈরাচারী শাসনের নিন্দা করে একটি 'Petition of Rights পেশ করে। এ আবেদনপত্রে দাবি করা হয় যে, রাজা পার্লামেন্টের অনুমোদন ছাড়া কোন কর ধার্য করবে না। রাজা প্রথম চার্লস বাধ্য হয়ে এ দাবি মেনে নেন।


১৫. গৌরবময় বিপ্লব : ১৬৫৮ সালে ক্রমওয়েলের মৃত্যু হলে | পার্লামেন্ট ও স্টুয়ার্ট রাজাদের মধ্যে সংঘটিত বিরোধের মীমাংসা হয় বিনা রক্তপাতে ঐতিহাসিক 'গৌরবময় বিপ্লব' বা 'Glorious Revolution' এর মাধ্যমে। স্টুয়ার্ট রাজা দ্বিতীয় জেমস্ দেশ থেকে বিতাড়িত হন। ফলে স্টুয়ার্ট রাজাদের রাজত্বের অবসান ঘটে।


১৬. অধিকারের বিল (১৬৮৯) : ব্রিটেনে শাসনতন্ত্রের বিবর্তন ও পার্লামেন্টের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে 'Bill of Rights' একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে ইংল্যান্ডে রাজার ক্ষমতার পরিবর্তে পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।


১৭. শস্য আইন ও সংস্কার আইন : ১৮১৫ সালে শস্যের আমদানি বন্ধ করে দেশীয় ভূস্বামীদের মুনাফা সংরক্ষণের জন্য শস্য আইন প্রণীত হয়। ১৮৩২ সালের সংস্কার আইনের ভিত্তিতে ই ভোটাধিকার সম্প্রসারণের ব্যবস্থা করা হয় এবং ১৯২৮ সাল নাগাদ নারী পুরুষ নির্বিশেষে ২১ বছর বয়স্ক সকল নাগরিক স ভোটাধিকার লাভ করে।


উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, ব্রিটিশ সংবিধান ও তার রাজনৈতিক জীবনের পরিচয় তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্রমবিকাশের সাথে সাথে গঠিত ও বিবর্তিত হয়েছে। একটি নিরবচ্ছিন্ন পরিবর্তনের স্রোতে এগিয়ে চলেছে। তাই একে অনেক সময় নদীর গতির সাথে তুলনা করা হয়। আইভর জেনিংস এর মতে, যদি ব্রিটিশ শাসনতন্ত্র কতকগুলো দলিল নিয়ে গঠিত না হয়ে সংগঠন নিয়ে গঠিত হয়। তবে বলা যায়, ব্রিটিশ শাসনতন্ত্র গড়ে উঠেছে, তৈরি করা হয়নি। সুতরাং দীর্ঘ পনেরোশ বছরের ক্রমবিকাশের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ সংবিধান বর্তমান অবস্থায় এসে উপনীত হয়েছে।

Q:2) ব্রিটিশ সংবিধানের উৎস -Sources of the British Constitution

গ্রেট ব্রিটেনের সংবিধান একটি অলিখিত সংবিধান। এটি ইতিহাসের ক্রমবর্ধমান বিবর্তনের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। ব্রিটেনের সংবিধান কোন নির্দিষ্ট উৎস থেকে উৎসারিত হয় নি। এর একাধিক উৎস রয়েছে। ব্রিটেনের সংবিধান অলিখিত হলেও এর কিছু কিছু লিখিত অংশও রয়েছে। বাস্তবে, ব্রিটেনের সংবিধান লিখিত এবং অলিখিত উভয় প্রকার উপাদানের সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে। বস্তুতঃ একে লিখিত আইন এবং আচার ও প্রথার এক অপূর্ব সমন্বয় বলে উল্লেখ করা যায়। নিম্নলিখিত ঐতিহাসিক উপাদানগুলো গ্রেট ব্রিটেনের সংবিধানকে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। যথা:

ঐতিহাসিক সনদ

ব্রিটিশ সংবিধানের উৎসগুলোর মধ্যে ঐতিহাসিক সনদের স্থান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এ সংবিধান মূলতঃ একাধিক সনদ ও চুক্তির সমন্বয়ে গঠিত। এ সকল সনদ ও চুক্তি শাসক ও শাসিতের সম্পর্ক এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও কর্তব্যসমূহ নির্ধারণ করে থাকে। ফলে তা শাসনতন্ত্রের উৎস রূপে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলঃ ১২১৫ সালের মহাসনদ (ম্যাগনাকার্টা ), ১৬২৮ সালের পিটিশন অব রাইটস, ১৬৮৯ সালের অধিকারের বিল ইত্যাদি। এগুলো ব্রিটেনের সংবিধানের বিকাশ ধারায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ নিদের্শক হিসেবে বিদ্যমান। নাগরিক অধিকার এবং শাসক-শাসিতের সম্পর্ক এসব দলিলে বিবৃত হয়েছে।


বিধিবদ্ধ আইন

ব্রিটেনের পার্লামেন্ট কর্তৃক প্রণীত আইনগুলো ব্রিটেনের সংবিধানের অন্যতম উৎস। এ সকল আইন ব্রিটেনের পার্লামেন্টে বিভিন্নভাবে প্রণীত হয়েছে। ১৭০১ সালের হেবিয়াস কর্পাস এ্যাক্ট সেটেলমেন্ট, ১৬৭৯, ১৮৩২, ১৮৬৭ এবং ১৮৮৪ সালের সংস্কার আইন সমূহ, ১৯২৮ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইন প্রভৃতি সংবিধানের উৎস হিসেবে উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া ১৯১১ এবং ১৯৪৯ সালের পার্লামেন্ট অ্যাক্ট লর্ড সভার ক্ষমতা সীমিত করে সংবিধানের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

বিচার বিভাগীয় সিদ্ধান্ত 
ব্রিটেনে বিচার বিভাগীয় সিদ্ধান্ত বা বিচারকদের রায় ও ব্যাখ্যা ব্রিটিশ সংবিধানের উৎস বলে বিবেচিত হয়েছে। বিচার কালে বিচারকগণ বিভিন্ন সনদ, প্রথাগত আইন এবং বিধিবদ্ধ আইনের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে নতুন সাংবিধানিক আইনের সৃষ্টি করেছেন। ডাইসির মতে, “ইংল্যান্ডের সংবিধান বিচারকের দ্বারা তৈরি সংবিধান”। ফলে অনেকে ব্রিটেনের সংবিধানকে “বিচারক প্রণীত সংবিধান" (Judge made constitution) বলে থাকেন।

সাধারণ আইন
ব্রিটেনের সাধারণ আইনগুলো রাজার আদেশ অথবা পার্লামেন্টের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয় নাই, বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রথার ভিত্তিতেই বিকাশ লাভ করেছে, বিচারকার্য পরিচালনার সময় বিচারকেরা প্রথাগুলোকে স্বীকার করেন, ব্যক্তির মামলায় প্রয়োগ করেন এবং পরবর্তী মামলার নিষ্পত্তির জন্য এগুলো নজির হিসাবে গণ্য করেন। অধ্যাপক অগ্-এর মতে, “এসব রীতি-নীতি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রচলিত থেকে অলংঘনীয়, সুচারু এবং স্থায়ী হয়ে উঠেছে।” এরূপ আইন বিভিন্ন নাগরিক স্বাধীনতারও নিশ্চয়তা দিয়ে থাকে । যেমন জনসাধারণের পৌর-স্বাধীনতা, সভা সমিতির স্বাধীনতা, রাষ্ট্রের ভিতরে ও বাইরে ব্যক্তি মর্যাদা ও পবিত্রতা রক্ষার ব্যবস্থা ইত্যাদি।

প্ৰথা সমূহ

গ্রেট ব্রিটেনের সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হচ্ছ প্রচলিত প্রথা বা প্রথাগত বিধান। প্রথাগত বিধানকে ব্রিটেনের সংবিধানের কেন্দ্র ও আত্মা বলা হয়। প্রথাগুলো আইন নয়, কিন্তু আইনের মত মান্য করা হয়। কিন্তু যারা শাসন পদ্ধতির সাথে সংশ্লিষ্ট রয়েছেন, যারা রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিচালনা করেন অথবা যারা সরকারের বিরোধিতা করেন তাঁরা সকলেই প্রথাগুলো মেনে চলেন। গ্রেট ব্রিটেনের রাজনীতির ক্ষেত্রে এটা সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে। অগ-এর মতে, “প্রথাগুলো এমন কতকগুলো বুঝাপড়া ও অভ্যাস যা সরকারী কর্তৃপক্ষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও ক্রিয়াকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।” গ্রেট ব্রিটেনের পার্লামেন্টের কার্যপদ্ধতি, পার্লামেন্ট ও মন্ত্রিপরিষদের সম্পর্ক, ক্যাবিনেটের কাজ ও রাজার ক্ষমতা প্রভৃতি বিষয়গুলো প্রথাগত বিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে।

বিখ্যাত আইনবিদদের লেখনী 

বিখ্যাত আইনবিদদের লেখা প্রস্তাবগুলো বিভিন্নভাবে গ্রেট ব্রিটেনের সংবিধানকে প্রভাবিত করেছে। এ সমস্ত লেখকদের রচনায় সংবিধানের আইন সম্পর্কে মূল্যবান ভাষ্য দেখতে পাওয়া যায়। লেখকগণ তাঁদের লেখনীতে প্রথাগত বিধানগুলোকে বিধিবদ্ধ করেছেন। একটির সাথে অন্যটির সম্পর্ক স্থাপন করেছেন ও একটি কেন্দ্রীয় নীতির সাথে সামঞ্জস্যমূলকভাবে এগুলোকে ব্যাখ্যা করছেন। কোন বিষয়ে ইংল্যান্ডের সাংবিধানিক বিধান বুঝার জন্য এসব ভাষ্য পাঠ করা যেতে পারে। ওয়ালটার বেজহট, এ. ভি. ডাইসী, হ্যারল্ড লাস্কি, ডব্লিউ. আর. অ্যানসন প্রমুখের গ্রন্থ উল্লেখযোগ্য।

চূড়ান্ত কথা

ব্রিটিশ সংবিধানের উৎস বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, গ্রেট ব্রিটেনের সংবিধান কোন সচেতন প্রচেষ্টার ফল নয়। বরং তা দেশাচার, প্রচলিত বিধিবিধান, বিচারালয়ের সিদ্ধান্ত ও অতীতের ঐতিহ্যের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। এই সংবিধান বিশেষ একটি উৎস হতে উৎসারিত হয় নি, বরং তা বহু উৎসের ফলস্বরূপ। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে এ সংবিধান পরিবর্তিত অবস্থার মোকাবেলা করতে সমর্থ হয়েছে। যুগের পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ব্রিটেনের সংবিধান বারবার পরিবর্তিত হয়ে বর্তমান রূপ লাভ করেছে।

(Q:3)ব্রিটিশ সংবিধান তৈরি হয়নি বরং গড়ে উঠেছে 

সাধারণত চারটি পদ্ধতিতে সংবিধান রচিত হয়। এগুলো মঞ্জুরি, সুপরিকল্পিত রচনা, বিপ্লব ও বিবর্তন। এদের মাধ্যমে ক্রমবিবর্তনের মাধ্যমে ব্রিটিশ সংবিধান গড়ে উঠেছে। ক্রমবিবর্তন বলতে পর্যায়ক্রমিক বিকাশ ধারাকে বুঝানো হয়। অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোনো আইনসভা নির্ধারিত কোনো সময়ে এ ধরনের সংবিধান রচনা করেনি। ব্রিটিশ জাতির ইতিহাস আড়াই হাজার বছরের পুরোনো হলেও পঞ্চম শতক থেকে সেখানে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ বিকাশ লাভ করতে শুরু করে। এভাবে শত শত বছরের শাসনতান্ত্রিক ও বিবর্তন প্রক্রিয়ায় ব্রিটিশ সংবিধান গড়ে ওঠে।

“ব্রিটিশ সংবিধান গড়ে উঠেছে, তৈরি করা হয়নি”-এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে আমাদের আলোচনা করতে হবে কোন কোন বিশেষ ঘটনা বা বাস্তবতাকে ঘিরে ব্রিটিশ সংবিধান প্রবৃদ্ধি লাভ করেছে। নিম্নে এসব বিষয়সমূহের সংক্ষিপ্ত আলোচনা কর হলো 

১. ঐতিহাসিক সনদ ও চুক্তিপত্র : ব্রিটেনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ে সামস্তশ্রেণি ও বণিকশ্রেণির চাপে এবং বিভিন্ন আন্দোলনের ফলে ব্রিটেনের রাজন্যবর্গ সনদ ও চুক্তিপত্রের মাধ্যমে কতগুলো অধিকার স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ১২১৫ সালের ‘মহাসনদ’, ১৬২৮ সালের ‘অধিকারের আবেদনপত্র’, ১৬৮৮ সালের ‘অধিকারের বিল’, ১৭০৭ ও ১৮০০ সালের যথাক্রমে স্কটল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে সংযুক্তিকরণের চুক্তিপত্র ইত্যাদির কথা। উল্লেখ করা যায়। এগুলো ব্রিটিশ সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়।

বিধিবদ্ধ আইন : নিজ ক্ষমতা বৃদ্ধি সাধন, জনগণের ভোটাধিকার সম্প্রসারণ, রাজার ক্ষমতার সংকোচন, উৎকর্ষ সাধন ইত্যাদি কারণে বিভিন্ন সময়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট আইন প্রণয়ন করেছে। এগুলো ব্রিটিশ সংবিধানের প্রধান উৎ হিসেবে বিবেচিত হয়। এসব বিধিবদ্ধ আইনের মধ্যে ১৬৭৯ সালে প্রণীত ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সম্পর্কিত ‘হেবিয়াস কর্পাস আইন’, ১৭০১ সালে প্রণীত সিংহাসনের উত্তরাধিকার ব্যবস্থা সম্পর্কিত ‘নিষ্পত্তি আইন’, ১৮৩২, ১৮৬৭, ১৮৮৪-৮৫ সালে প্রণীত ভোটাধিকার সম্প্রসারণ সংক্রান্ত ‘সংস্কার আইন’ এবং ১৯১১ ও ১৯৪৯ সালে প্রণীত পার্লামেন্টের ক্ষমতা বিষয়ক ‘পার্লামেন্ট আইন’ ইত্যাদি বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

২. বিচার বিভাগীয় সিদ্ধান্ত : সনদ, চুক্তি ও বিধিবদ্ধ আইনের মধ্যে অনেক সময় অস্পষ্টতা থেকে যায়। বিচার বিভাগ সেগুলোর ব্যাখ্যা প্রদান করতে গিয়ে নতুন আইন সৃষ্টি করে। তবে যুক্তরাজ্যের বিচার বিভাগ পার্লামেন্ট প্রণীত আইনের ব্যাখ্যা প্রদান করতে পারলেও এরূপ কোনো আইনকে অবৈধ বলে ঘোষণা করতে পারে না। অধ্যাপক ডাইসির মতে, ব্যক্তির অধিকারসমূহ প্রতিষ্ঠার জন্য বিচারালয়ে আনীত মামলার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই সংবিধানের সাধারণ সূত্রসমূহ গড়ে উঠেছে। তিনি যুক্তরাজ্যের সংবিধানকে ‘বিচারকগণ কর্তৃক রচিত সংবিধান’ বলে বর্ণনা করেছেন। বস্তুত ব্যক্তিস্বাধীনতা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে পার্লামেন্ট প্রণীত আইন অপেক্ষা বিচার বিভাগের সিদ্ধান্ত অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।

৩. প্রথাগত আইন : প্রথাগত আইন হলো সুদীর্ঘকাল যাবত প্রচলিত সেসব রীতিনীতি যেগুলো কালক্রমে আদালতের মাধ্যমে আইনরূপে স্বীকৃতি লাভ করেছে। প্রথাগত আইনসমূহ পার্লামেন্ট কর্তৃক প্রণীত হয় না কিংবা রাজন্যবর্গ সেগুলোকে অর্ডিন্যান্স হিসেবে ঘোষণা করে না। তবে অনেক প্রথাগত আইন কালক্রমে পার্লামেন্ট কর্তৃক স্বীকৃতি লাভ করে বিধিবদ্ধ আইনে রূপান্তরিত হয়েছে। রাজার বিশেষ ক্ষমতা, জুরির সাহায্যে বিচার, বাকস্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা ইত্যাদি প্রথাগত আইনের প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

৪. শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি : শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতিসমূহের ভিত্তিতেও ব্রিটিশ সংবিধান গড়ে উঠেছে। শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতিসমূহ আইনের ন্যায় আদালত কর্তৃক বলবৎযোগ্য না হলেও সেগুলো আইন অপেক্ষা কোনোক্রমেই কম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে না । রাজার সঙ্গে মন্ত্রিদের সম্পর্ক, মন্ত্রিদের সঙ্গে পার্লামেন্টের সম্পর্ক, পার্লামেন্টের কার্যপদ্ধতি, লর্ডসভা ও কমন্সসভার মধ্যে সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয় শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতিসমূহের অন্তর্ভুক্ত।

৫. প্রামাণ্য পুস্তক : সংবিধান সম্পর্কে রচিত প্রামাণ্য পুস্তকসমূহকেও অনেকে ব্রিটিশ সংবিধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস বলে বর্ণনা করেছেন। এসব প্রামাণ্য পুস্তকের মধ্যে ওয়াল্টার বেজট লিখিত ‘ইংল্যান্ডের সংবিধান’, মে-এর ‘সংসদীয় প্ৰথা’, অ্যানসনের ‘সংবিধানের আইন ও রীতিনীতি’, ডাইসির ‘সংবিধানের আইন’, আইভর জেনিংস রচিত ‘আইন এবং সংবিধান ও ক্যাবিনেট শাসনব্যবস্থা’, লাস্কির ‘ইংল্যান্ডের শাসনব্যবস্থা’, অ্যামেরির রচিত ‘সংবিধান সম্পর্কিত চিন্তা’ ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ।

(Q:4) ব্রিটেনে রাজা বা রানীর ক্ষমতা ও কার্যাবলী আলোচনা করুন।







(Q:5)ব্রিটেনে রাজতন্ত্র টিকে থাকার কারণ কি?

Answer: 
ব্রিটেনের রাজতন্ত্র সমগ্র ইউরোপের একটি পরিচিত প্রতিষ্ঠান। যে ব্যবস্থায় রাজা বা রানী বংশানুক্রমে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। A. C. Kapur-এর ভাষায়, “In the course of history, those power have been almost entirely transferred from the kings as a person to a complicated impersonal organization called the Crown”. রাজতন্ত্রের শুরুর দিকে রাজা চরম ও স্বৈরাচারী ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। রাজাদের ব্যক্তিগত অভিরুচি অনুসারে ব্রিটেনের শাসন ব্যবস্থা পরিচালিত হত। ঐ সময় রাজার 'ব্যক্তিগত ভূমিকার' প্রতিষ্ঠানগত রাজতন্ত্রের কোন পার্থক্য ছিল না। রাজা বা রানীর প্রতিষ্ঠানিক রাজপ্রতিষ্ঠান। এটা ব্যক্তি রাজা বা ব্যক্তি রানীর মৃত্যুতে বিলুপ্ত হয় না।

ব্রিটেনের রাজতন্ত্র একদিনে গড়ে উঠেনি। ধীরে ধীরে প্রথাগত বিধানের দ্বারা রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। সময়ের প্রেক্ষিতে ব্রিটেনের রাজতন্ত্রটিকে থাকার কথা ছিল না। কিন্তু আজও ব্রিটেনে রাজতন্ত্র টিকে আছে। এর পিছনে কতিপয় কারণ বিদ্যমান রয়েছে। স্যার আইভর জেনিংস সহ বিভিন্ন রাষ্ট্রচিন্তাবিদ এর বহুবিধ কারণের কথা বলেছেন। এগুলো নিম্নরূপ:

১. রক্ষণশীলতা: রক্ষণশীলতা রাজতন্ত্র টিকে থাকার প্রথম কারণ। ইংরেজ জাতি অধিক মাত্রায় রক্ষণশীল। তারা কোন মৌলিক পরিবর্তনে আগ্রহী নয়। সনাতন ঐতিহ্যের প্রতি ইংরেজ জাতির আন্তরিক টান অনেক দিনের। দীর্ঘ দিন ধরে বিদ্যমান সকল প্রথা, রীতিনীতি ও প্রতিষ্ঠানকে ইংরেজ জাতি মনে প্রাণে ভালোবাসে। রাজতন্ত্র হল ব্রিটেনের তেমনি একটি প্রতিষ্ঠান। স্বভাবতই এর প্রতি তাদের শ্রদ্ধা জড়িত।

২. গণতন্ত্রীকরণ: গণতন্ত্রীকরণের কারণে ব্রিটেনে রাজতন্ত্র আজও টিকে আছে। ব্রিটেনের রাজতন্ত্র তন্ত্র আজ নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রে পরিণত রয়েছে। এ রাজতন্ত্র ব্রিটেনের গণতন্ত্রের পথে কোন বাধা সৃষ্টি কি করেনি। গণতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণার সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজতন্ত্র প্রবাহমান। এ ব্যবস্থা সংসদীয় গণতন্ত্রের ত সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেছে। গৌরবময় বিপ্লবের (১৬৮৮) পর থেকে রাজা পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব মেনে নিয়েছে।

৩. সংসদীয় ব্যবস্থার সমর্থক : ব্রিটেনে সংসদীয় ব্যবস্থা বিদ্যমান। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রাজা বা রানীর গুরুত্ব কম নয়। তিনি মন্ত্রিসভাকে সর্বত্রই সহায়তা করেন। তত্ত্বগতভাবে সকল ক্ষমতা রাজার নামে পরিচালিত হয়। বাস্তবে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা সকল ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। রাজা বা রানী এ ধরনের শাসন ব্যবস্থায় কোন সমস্যা সৃষ্টি করছে না। এ কারণে রাজতন্ত্র টিকে আছে।

৪. রাজপদের ব্যবহারিক মূল্য : রাজপদের ব্যবহারিক মূল্যের কারণে ব্রিটেনে রাজতন্ত্র বিদ্যমান। ব্রিটেনে মন্ত্রিসভার পরামর্শদাতা হিসেবে রাজশক্তির ব্যবহারিক মূল্য অনেক। তিনি নীতি নির্ধারণে মন্ত্রিসভাকে পরামর্শ দেন। এক্ষেত্রে তার গুরুত্ব অপরিসীম। তারা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন আবার চলে যান। কিন্তু রাজা বা রানী সারাজীবন পদে আসীন থাকেন। কিন্তু মন্ত্রিসভার উত্থান-পতন হয়।

৫. ধারাবাহিকতা: ব্রিটেনে আজও প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বিদ্যমান। রাজা বা রানী ঐ ব্যবস্থায় এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। ব্রিটেনের মন্ত্রিসভার পতন ও গঠনের সময় রাজার ভূমিকা অপরিসীম। এ সময় রাজা বা রানী প্রশাসনের হাল ধরেন। এ সময় তিনি ধারাবাহিক ভাবে দায়িত্ব পালন করেন। অন্যথায় ধারাবাহিকতা বিনষ্ট হয়ে যাবে।

৬. কম ব্যয়বহুল: ব্রিটেনের রাজতন্ত্র জাক জমকপূর্ণ, কিন্তু ব্যয়বহুল নয়। বাৎসরিক বাজেটের সামান্য অংশ এর পিছনে ব্যয় হয়। এ ব্যয় রাজস্বের শতকরা একভাগ মাত্র। উপযোগিতার তুলনায় এ ব্যয় অনেক কম। রাষ্ট্র প্রধান নির্বাচনে নির্বাচন পদ্ধতির মাধ্যমে হলে ব্যয়ের পরিমাণ বেশী হত।

৭. মনস্তাত্তিক কারণ : মনস্তাত্তিক কারণে ব্রিটেনে আজও রাজতন্ত্র টিকে আছে। এটি রাজতন্ত্র টিকে থাকার সব চেয়ে বড় কারণ। মনস্তাত্তিক দিক থেকে ব্রিটেনে রাজতন্ত্রের গুরুত্ব অপরিসীম। ব্রিটেনের রাজা বা রানী জনগণের কাছে পিতা-মাতার ন্যায় প্রতিভাত হন। তিনি সর্বদা বিভিন্ন সমস্যা ও তার সমাধান সম্পর্কে আন্তরিকভাবে আলাপ আলোচনা করেন। প্রয়োজন মত বিভিন্ন পরামর্শ দেন।

৮. ঐক্যের প্রতীক: ব্রিটেনের রাজা বা রানী ঐক্যের প্রতীকরূপে খ্যাত। তাকে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি ঐক্যের ধারক ও আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রস্থল। রাজা বা রানী সমগ্রদেশ ও দেশবাসীর অনুকূলে কথা বলেন। এ ভাবে তিনি ঐক্যের বন্ধন সৃষ্টি করেন।

৯. সংযোগ সৃষ্টি: ব্রিটেনের রাজতন্ত্র কমনওয়েলথের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করে থাকে। রাজা বা রানী হলেন কমনওয়েলথের প্রধান। ডোমিনিয়ন স্টেটগুলোর মধ্যে তিনি যোগসূত্র স্বরূপ। কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলো পূর্বে গ্রেট ব্রিটেনের উপনিবেশ ছিল। রাজশক্তির মাধ্যমে এই দেশগুলোর সঙ্গে সংযোগ সৃষ্টি হয়।

১০. আনুষ্ঠানিকতা: আনুষ্ঠানিকতা ব্রিটেনের শাসনব্যবস্থার একটি বৈশিষ্ট্য। ব্রিটেনের প্রশাসনিক ক্ষেত্রে রাজা বা রানী আনুষ্ঠানিক ভূমিকা পালন করেন। এখানে যাবতীয় কাজকর্ম রাজা বা রানীর নামে সম্পাদিত। বিচারকার্যও তাঁর নামে সম্পাদিত হয়। তার নামে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়। জনগণ ব্যক্তি হিসেবে রাজায় প্রতি অনুরক্ত। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে তার দায়িত্ব পালন করেন।

১১. নিরপেক্ষতা: নিরপেক্ষতা ব্রিটেনের রাজতন্ত্রের পিছনে ইন্ধন যোগায়। রাজা বা রানী ব্রিটেনের শাসন ব্যবস্থায় নিরপেক্ষ ব্যক্তি। তিনি নিরপেক্ষভাবে তাঁর দায়িত্ব পালন করেন। রাজা বা রানী দলাদলির উর্ধ্বে থাকেন। তাঁর এ নিরপেক্ষতা রাজতন্ত্রকে বহাল রেখেছে।

১২. ব্যক্তিগত প্রভাব: ব্রিটেনে রাজতন্ত্র টিকে থাকার অন্যতম কারণ হল রাজা বা রানীর ব্যক্তিগত প্রভাব। ব্যক্তিগতভাবে তিনি অভিজ্ঞতা, দূরদর্শিতার পরিচয় দেন। এর মধ্যে ব্রিটেনের রাজশক্তির অস্তিত্বের কারণ নিহিত। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হল মহারানী ভিক্টোরিয়া। তিনি জনগণের কাছে ছিলেন জননী সাদৃশ্য। রাজা জর্জ জনগণের জনকের মর্যাদা পেয়ে ছিলেন। সুতরাং রাজপদের ব্যক্তিত্বের প্রভাব রাজতন্ত্র টিকে থাকার অন্যতম কারণ।

১৩. জাঁকজমক ও বৈচিত্র্যের উৎস : ব্রিটেনের রাজা বা রানী জাঁকজমক ও বৈচিত্র্যের উৎস। এক ঘেয়েমী মানবজীবনে জাঁকজমক ও বৈচিত্র্যের বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে। ব্রিটেনে সাধারণ মানুষকে রাজা বা রানী জাঁকজমকের সাথে জাগিয়ে তোলেন। সরকারী কার্যধারার মধ্যে তিনি বৈচিত্র সৃষ্টি করেন। আড়ম্বর ও সমারোহ প্রভৃতি সরকারী কাজের জন্য অপরিহার্য। এরূপ জাঁকজমক ও বৈচিত্র রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে উদ্যম সৃষ্টি করে।

১৪. চিরন্তন প্রতিনিধি : রাজা বা রানী ব্রিটেনের শাসন ব্যবস্থায় চিরন্তন প্রতিনিধি। তাঁর এ অসাধারণ অবদান রাজনীতিবিদদের পক্ষে সম্ভব নয়। নিরপেক্ষতার কারণে তাঁর নামে সরকারী কার্যাদি পরিচালিত হয়। এ কারণে জনগণের চোখে সরকারের মর্যাদা সমুন্নত থাকে। তিনি রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি হিসেবে জাতীয় মহিমা ও গৌরব সমুন্নত রাখেন।

উপসংহার: রাজতন্ত্র ব্রিটেনের রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এ প্রতিষ্ঠানটি অনেক প্রাচীন। সুদীর্ঘকালের বিবর্তনের ধারায় ব্রিটেনের রাজতন্ত্র নিরবিচ্ছিন্নভাবে আজও টিকে আছে। রাজতন্ত্রের শুধু আকারগত দিকের পরিবর্তন ঘটেছে। অ্যাংলোসেক্সন যুগ থেকেই রাজসিংহাসন সৃষ্টি হয়। এ সময় থেকে রাজতন্ত্রের উদ্ভব। যদিও ব্রিটেনে সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা বিদ্যমান- তবুও রাজতন্ত্র টিকে আছে।


(6) প্রথা কি ? ব্রিটিশ সংবিধানে প্রথা কেন মান্য করা হয়?

প্রথা: প্রথা বলতে বুঝায় সামাজিকভাবে স্বীকৃত এমন কিছু পন্থা বা রীতি ও পদ্ধতি যা বিভিন্ন সামাজিক কার্যকলাপ পালনে অনুশীলন করা হয়। সমাজে বসবাস করতে গিয়ে মানুষ অবচেতন মনেই প্রথাকে স্বীকার করে নেয়। ম্যাকাইভারের মতে, “The Socially accredited ways of acting are the customs of the society” সমাজ স্বীকৃত আচরণবিধি এবং কার্যপ্রণালিই হচ্ছে প্রথা। প্রথা বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। যথা- (১) নিত্যদিনের স্বাভাবিক কাজকর্ম, (২) নিত্যদিনের কাজকর্মের পন্থা প্রণালি, (৩) পারস্পরিক সামাজিক আচরণ এবং ক্রিয়ার মধ্যে প্রতিফলিত সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যসমূহ।


বৃটেনের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রথা মান্য করার কারণ: বৃটেনের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রথা বা শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি কেন মান্য করা হয় নিম্নে তা উপস্থাপন করা হল:

১. জনমতের চাপ: ব্রিটেনের শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতিগুলো মেনে চলার মূল কারণ হল জনমতের চাপ। এগুলোর পিছনে ব্রিটেনের জনগণের সুদৃঢ় সমর্থন সবসময় বর্তমান। এ জনসমর্থনই হল প্রথা মান্য করার মূল চালিকাশক্তি। কেননা জনসমর্থন হরানোর ভয়ে কোন দলীয় সরকার এগুলো অমান্য করতে পারে না।

২. ভারসাম্য রক্ষা: প্রথা ব্রিটেনের শাসনব্যবস্থার ভারসাম্য বজায় রাখার ব্যাপারে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।প্রথাকে অগ্রাহ্য করলে ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থা ভারসাম্যহীনতায় ভুগবে। এর ফলে ব্রিটেনের সরকারি কাঠামো গতিহীন হয়ে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিবে।

৩. ব্রিটিশ জাতির রক্ষণশীলতা ও ঐতিহ্যপ্রিয়তা: শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতিগুলো ব্রিটেনের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস ও গৌরবময় ঐহিত্যের সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। ব্রিটিশ প্রকৃতিগতভাবে রক্ষণশীল মনোভাবাপন্ন হওয়ায় রীতিনীতিগুলোকে মান্য করার মধ্য দিয়ে তারা অতীত গৌরবকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ অনুভব করে।

৪. শাসনতন্ত্রের ধারাবাহিকতা সংরক্ষণ: অতীতের সাথে বর্তমানের এবং বর্তমানের সাথে ভবিষ্যতের যোগসূত্র স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রথা অনবদ্য ভূমিকা পালন করে সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে। তাই প্রথা মান্য করা হয়।

৫. রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ: সুদীর্ঘ কাল ধরে গড়ে উঠা শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতির পশ্চাতে জনগণের সুদৃঢ় সমর্থন থাকায় কেউ এগুলোকে উপেক্ষা করার সাহস পায় না। যদিও এগুলো অমান্য করায় কোন শাস্তির ভয় নেই, তবুও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়ার আশঙ্কা থাকে।

৬. নদনীয় ও গতিশীল সংবিধান প্রতিষ্ঠা: প্রথাগত বিধান সংবিধানকে নমনীয় ও গতিশীল করে। আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান হয় না এবং সম্ভব ও নয়। এক্ষেত্রে প্রথার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৭. জনসমর্থন: গ্রেট বৃটেনের শাসন ব্যবস্থায় বিভিন্ন শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত আছে। দেশবাসীর রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে এগুলি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। আইন ও রীতিনীতির মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক পার্থক্যের ব্যাপারে সাধারণ মানুষ আগ্রহ দেখায় না। শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতিগুলি সহজবোধ্য হওয়ায় তা অধিক জনপ্রিয়।

৮. শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতিগুলির আইনে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা: শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি অমান্য করলে তা আইনে পরিণত হবে এই আশঙ্কায় তা মান্য করা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে। যেমন লর্ড সভা ১৯০৯ সালে শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি উপেক্ষা করে কমন্স সভা কর্তৃক অনুমোদিত রাজস্ব বিল প্রত্যাখ্যান করে। তার ফলে লর্ডসভার ক্ষমতা হ্রাস করে ১৯১১ সালে পার্লামেন্টে আইন প্রণীত হয়। এ আইনের মাধ্যমে অর্থ বিলের ব্যাপারে লর্ড সভার ক্ষমতা প্রায় কেড়ে নেওয়া হয়।

৯. বাস্তব উপযোগিতা: সাংবিধানিক প্রথা লঙ্ঘন ব্রিটেনে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার কার্যকারিতাকে ক্ষুণ্ণ করে। তাছাড়া সাংবিধানিক রীতিনীতি সরকারকে সময়ের প্রয়োজনের সাথে খাপখাইয়ে নেয়। তাই এ বাস্তব উপযোগিতার উপলব্ধি রীতিনীতিগুলোকে মান্য করতে উদ্বুদ্ধ করে। ফ্রিম্যান বলেছেন, “সাংবিধানিক রীতিনীতির গুরুত্বকে যেহেতু অস্বীকার করা যায় না, তাই এগুলোকে মান্য করা হয়ে থাকে।”

১০. শাসনব্যবস্থায় ভারসাম্য রক্ষা: শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতিগুলো ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থার ভারসাম্য রক্ষা করে তাকে সচল রাখে। এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে কার্টার, রেনি ও হার্জ বলেছেন, “রীতিনীতিগুলোকে অমান্য করা হলে শাসনব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়বে এবং সামগ্রিকভাবে সরকারি যন্ত্র অচল হয়ে যাবে।”

১১. আইনে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা: সাংবিধানিক রীতিনীতি অমান্য করা হলে তা আইনে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই এ সম্ভাবনা ও সাংবিধানিক রীতিনীতি মেনে চলতে বাধ্য করে। ১৯০৯ সালে লর্ডসভা সাংবিধানিক রীতিনীতি লঙ্ঘন করে কমন্সসভা কর্তৃক গৃহীত রাজস্ব বিলকে অগ্রাহ্য করে। আর এ কারণেই কমন্সসভা লর্ডসভার ক্ষমতা হ্রাসের জনা ১৯১১ সালের ‘পার্লামেন্টারি অ্যাক্ট’ বিধিবদ্ধ করে।

১২. ক্যাবিনেটের অস্তিত্ব রক্ষা: ব্রিটেনে কমন্সসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সদস্যদের নিয়ে ক্যাবিনেট গঠিত। ক্যাবিনেটের পরামর্শক্রমে রাজা বা রানী ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। কমন্সসভার আস্থা হারালে ক্যাবিনেটের পতন ঘটে, লর্ডসভার উপর কমন্সসভার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব সাংবিধানিক প্রথাগুলো মান্য করা হয়, কারণ এসব প্রথা অমান্য করলে ব্রিটেনের ক্যাবিনেট শাসনব্যবস্থার বুনিয়াদই ভেঙে পড়বে। বিঘ্নবের সম্ভাবনা কমায

১৩. রাজনৈতিক মনস্তাত্ত্বিক কারণ: সাংবিধানিক রীতিনীতিগুলো অমান্য করলে আদালতের মাধ্যমে বলবৎ করা যায় না বা অমান্যকারীর কোন শাস্তি হয় না বটে কিন্তু জনমনে বিরূপ প্রভাবের ভয়ে বা পরবর্তী নির্বাচনে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়ে সবাই এগুলো মেনে চলে।

১৪. আইন লঙ্ঘনের ভয়: ডাইসি মনে করেন, প্রথা লঙ্ঘন করা মানে পরোক্ষভাবে সায়ীয় আইন লঙ্ঘন করা। কারণ অনুসারে ব্রিটেনে প্রতি বছর ছর পার্লামেন্ট অধিবেশন বসে এবং রাজস্ব আদায় হয়। এ রাজস্ব নিয়েই তারা সামরিক প্রথা বাজেট অনুমোদন করে। তাই প্রথা ভঙ্গ করলে এ সকল কাজ স্থগিত থাকবে এবং প্রশাসনিক জটিলতা বৃদ্ধি পাবে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, ব্রিটিশ রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রথার উপযোগিতা অপরিসীম। এর বাস্তব মূল্য ও অনেক। প্রথা সংবিধান ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে সচল রেখেছে। এজন্য সরকার ও জনগণ সবাই প্রথাগত বিধান মেনে চলে।

(7) ব্রিটিশ কেবিনেট কি? এর ক্ষমতা ও কার্যাবলী 

ব্রিটিশ ক্যাবিনেটের গঠন :- 


ব্রিটিশ ক্যাবিনেট হল মন্ত্রিসভার এক ক্ষুদ্র আয়তন বিশিষ্ট সংস্থা। মন্ত্ৰীসভার বিশেষ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের নিয়ে ব্রিটিশ ক্যাবিনেট গঠিত হয়। ক্যাবিনেটের সদস্য সংখ্যা ২৫-৩০ জনের বেশি হয়না। কেবলমাত্র ক্যাবিনেটই রাজা বা রানীকে শাসন সংক্রান্ত বিষয়ে পরামর্শ প্রদান করতে পারে। ওয়েড ও ফিলিপস এর মতে , দেশের শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী রাজাকে পরামর্শ দেন। এ ব্যাপারে তাঁকে সাহায্য করার জন্য প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভার যে সকল সদস্যকে আহ্বান করেন , তাঁরাই ক্যাবিনেটের সদস্য হন। 

ব্রিটিশ ক্যাবিনেটের ক্ষমতা ও কার্যাবলী :- 


বর্তমানে ব্রিটিশ শাসন ব্যবস্থার মধ্যমনি হল ক্যাবিনেট। অথচ এই সংস্থাটির কোন আইনগত ভিত্তি নেই।  কিন্তু তাও ইংল্যান্ডের শাসনকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে ক্যাবিনেট মূল দায়িত্ব পালন করে। ক্যাবিনেটের ক্ষমতা ও কার্যাবলীগুলি নিম্নরূপ :- 

১. নীতি নির্ধারণ সংক্রান্ত ক্ষমতা :- জেনিংস এর মতানুসারে ক্যাবিনেট হল মূলত একটি নীতি নির্ধারণকারী সংস্থা। ক্যাবিনেট জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অবস্থা পর্যালোচনা করে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি নির্ধারণ করে থাকে। প্রতিটি দপ্তরের মন্ত্রী থাকলেও মূল নীতি নির্ধারণ করে ক্যাবিনেট। নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিচার বিবেচনার কারণে ক্যাবিনেট মূলতঃ একটি দলীয় কমিটি হিসাবে কাজ করে। 

২. আইন প্রণয়ন সংক্রান্ত ক্ষমতা :- প্রশাসনিক ক্ষেত্রে নীতি সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন। সেই বিষয়ে আইন প্রণয়ন করতে ক্যাবিনেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ক্যাবিনেটই আইনের প্রস্তাব প্রণয়ন করে , আইনের খসড়া উপস্থাপন করে এবং পার্লামেন্টে তা পরিচালনা করে। যেহেতু ক্যাবিনেটের সাথে সংখ্যা গরিষ্ঠের সমর্থন থাকে , সেহেতু আইন পাসের বিষয়টি সহজ হয়ে যায়। 

৩. পার্লামেন্টের কর্মসূচি নির্ধারণ সংক্রান্ত ক্ষমতা :- পার্লামেন্টের অধিবেশন আহ্বান করা , স্থগিত রাখা , পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা রাজা বা রানীর আছে। কিন্তু বাস্তবে ক্যাবিনেটই প্রকৃত ক্ষমতা প্রয়োগ করে। এমনকি পার্লামেন্টে কোন কোন বিল উপস্থাপন করা হবে , তাও নির্ধারণ করে ক্যাবিনেট। পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশনে রাজা বা রানী যে রাজকীয় ভাষণ প্রদান করেন - সে ক্ষেত্রেও রাজা বা রানী ক্যাবিনেটের সাথে আলোচনা করেন। 

৪. শাসন বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত ক্ষমতা :- আইনগত ভাবে রাজা বা রানী শাসন বিভাগের যাবতীয় ক্ষমতার অধিকারী। তবে ক্যাবিনেটের পরামর্শক্রমে ওই ক্ষমতা প্রযুক্ত হয়। বস্তুতঃপক্ষে ক্যাবিনেটই রাজা বা রানীর নামে দেশ শাসন করে। ব্রিটিশ শাসন ব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র হল ক্যাবিনেট। রামসে ম্যুর বলেছেন - '' ক্যাবিনেট হল রাষ্ট্ররূপ জাহাজের চালনীচক্র। '' এছাড়া বর্তমানে পার্লামেন্টের কাজকর্মের পরিধির বিস্তার ঘটেছে। তাই পার্লামেন্ট অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন দায়িত্ব ক্যাবিনেটের ওপর অর্পণ করে। 

৫. অর্থ ও বাজেট সংক্রান্ত ক্ষমতা :- সরকারের আয় - ব্যয় বা বাজেট সংক্রান্ত বিষয়েও ক্যাবিনেটের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। অর্থমন্ত্রী বাজেট পেসের আগে ক্যাবিনেটের সাথে আলোচনা করেন। ক্যাবিনেট অনুমোদন করলেই তা কমন্স সভায় পেস করা যায়। শাসন বিভাগের বিভিন্ন দপ্তরের ব্যয় - বরাদ্দের প্রস্তাবও ক্যাবিনেট বিবেচনা করে। 

৬. বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সংহতি স্থাপন :- শাসন বিভাগের কাজকর্ম বিভিন্ন দপ্তরের মাধ্যমে সম্পাদিত হয়। ক্ষমতা ও অধিকার নিয়ে সরকারি দপ্তরগুলির মধ্যে বিরোধের সম্ভাবনা প্রবল। তাই ক্যাবিনেট বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে ক্ষমতার পরিধি নির্ধারণ করে এবং বিভিন্ন দপ্তরগুলির মধ্যে যোগসূত্র রক্ষা করে ও সামঞ্জস্য বিধান করে। বর্তমানে ক্যাবিনেট একদিকে রাজার সঙ্গে পার্লামেন্টের ও পার্লামেন্টের সাথে শাসন বিভাগের সংযোগসাধন করে। এছাড়াও ক্যাবিনেট জনগণের সাথে সরকারের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে। 

৭. অন্যান্য ক্ষমতা :- অন্যান্য বিষয়ে ক্যাবিনেটের ক্ষমতাগুলি হল - 
(ক ) জাতীয় বা আন্তর্জাতিক স্তরে কোনো সমস্যার সৃষ্টি হলে ক্যাবিনেট সে বিষয়ে আলোচনা করে ও ব্রিটিশ সরকারের নীতি নির্ধারণ করে। 
(খ ) আগামী দিনের পরিস্থিতি ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে পরিকল্পনা প্রণয়ন ক্যাবিনেটকে করতে হয়। 
(গ ) ক্যাবিনেট সরকারি কর্মচারীদের পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করে। 
(ঘ ) বিভিন্ন সরকারি কৃত্যক কমিশন কর্মচারীদের নিযুক্ত করে। কিন্তু তাদের বেতন , ভাতা ও চাকরির শর্তাদি নির্ধারণ করে ক্যাবিনেট। 
(ঙ ) যে সকল এলাকা এখনো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত - সেই সকল এলাকাগুলিতে শাসন কার্য পরিচালনা করে ক্যাবিনেট। 

উপসংহার :- 

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে , বর্তমানে ক্যাবিনেটের ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ক্রসম্যানের মতানুসারে , দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে ব্রিটেনের শাসন ব্যবস্থাকে ক্যাবিনেট পরিচালিত না বলে প্রধানমন্ত্রী পরিচালিত বলা উচিত। কিন্তু ব্রিটিশ সংবিধান বিশেষজ্ঞরা সকলে এই মতের সাথে সহমত পোষণ করেন না। কেননা , প্রধানমন্ত্রী সর্বদা তাঁর সিদ্ধান্ত ক্যাবিনেটের উপর চাপিয়ে দিতে পারেন না। ক্যাবিনেটের কাজকর্মের উপর পার্লামেন্ট ও জনমতের প্রভাবকে অস্বীকার করা যায়না।   


(8) লর্ড সভার গঠন ও কার্যাবলী







(9)USA এর সংবিধানের বৈশিষ্ট্য










(10) USA এর সিনেটকে কেন পৃথিবীর শক্তিশালী কক্ষ বলা হয় 

ভূমিকাঃ মার্কিন আইনসভা কংগ্রেসের উচ্চকক্ষের নাম সিনেট। এ কক্ষকে অঙ্গরাজ্যসমূহের প্রতিনিধিত্বমূলক কক্ষও বলা হয়ে থাকে। মার্কিন সিনেট প্রতিনিধি সভার তুলনায় অধিক শক্তিশালী। শুধু তাই নয়, মার্কিন সিনেট বিশ্বের অন্যান্য দেশের দ্বিতীয় কক্ষের তুলনায় অধিক ক্ষমতাশালী। তাই মার্কিন সিনেটকে পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী দ্বিতীয় কক্ষ বলা হয়।

বিশ্বের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী দ্বিতীয় কক্ষ হিসেবে সিনেটঃ সিনেটকে বিশ্বের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী দ্বিতীয় কথ বলার কারণসমূহ নিচে উল্লেখ করা হল-

১. অইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেঃ
 রাশিয়া ও সুইজারল্যান্ডের আইনসভার উভয় কক্ষ সমক্ষমতাসম্পন্ন। ভারত ও ব্রিটেনের উচ্চ কক্ষ নিকক্ষ অপেক্ষা দুর্বল। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ কক্ষ সিনেট নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি সভার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। এছাড়া অর্থবিলের উপর সিনেটের যে ক্ষমতা রয়েছে ভারত, ব্রিটেন এবং আরও অনেক রাষ্ট্রের উচ্চ কক্ষের সেরূপ ক্ষমতা নেই। এজন্য J. P. Harris বলেছেন, "The United States senate is by all odds the most powerful upper chamber of any legislature in the world."

২. প্রশাসনিক ক্ষেত্রেঃ ভারত ও ব্রিটেনের সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা আইনসভার নিম্নকক্ষের হাতে ন্যস্ত। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সিনেট রাষ্ট্রপতি কর্তৃক কোন নিয়ােগ বৈদেশিক চুক্তি অনুমােদন না করলে তা কার্যকরী হয় না। অন্য কোন দেশের দ্বিতীয় কক্ষকে এরূপ ক্ষমতা দেয়া হয় নি।

৩. বিচারের ক্ষেত্রেঃ
 সিনেট প্রতিনিধি সভা কর্তৃক অভিযুক্ত ব্যক্তিদের অভিযােগ অনুসন্ধান ও বিচার করে থাকেন। কিন্তু ভারতের উচ্চ কক্ষ অভিযোেগ আনলে নিম্নকক্ষ তার বিচার করে। সুতরাং সিনেটের বিচার সংক্রান্ত ক্ষমতা ভারতের উচ্চ কক্ষের তুলনায় অনেক বেশি।

৪. বিভিন্ন বিল উত্থাপনের ক্ষেত্রেঃ কানাডায় রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একমাত্র অর্থবিলই সিনেটে উত্থাপিত হয়। এছাড়া যে কোন বিল সিনেট ছাড়া কমন্সসভায় উত্থাপিত হতে পারে। কানাডার সিনেটের সদস্যগণ গভর্নর জেনারেল কর্তৃক মনােনীত হন। অন্যদিকে, কমন্সসভার সদস্যগণ জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধি। এক্ষেত্রে সিনেটের ক্ষমতা কমন্সসভার চেয়ে অনেক কম। এদিক থেকে কানাডার সিনেট অপেক্ষা মার্কিন সিনেট অনেক বেশি শক্তিশালী। তাই মার্কিন সিনেটকে বিশ্বের সর্বাপেক্ষা দ্বিতীয় শক্তিশালী কক্ষ বলা যায়।

৫. মর্যাদার দিক থেকেঃ
 অস্ট্রেলিয়ার আইনসভার ক্ষেত্রে সাধারণ বিলগুলাে এমনকি অর্থবিলও প্রতিনিধি সভায় উত্থাপিত হয়। অস্ট্রেলিয়ার সিনেটের নিয়ােগ ও চুক্তি সংক্রান্ত বিষয়ে কোন ক্ষমতা নেই। উভয় কক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিলে গর্ভনর জেনারেল উভয় কক্ষ ভেঙে দিয়ে পুনরায় নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে পারেন। এক্ষেত্রে সিনেটের তুলনায় প্রতিনিধি সভার সদস্য সংখ্যা বেশি হওয়ায় তাদেরই জয় হয়। কিন্তু এদিক থেকে অস্ট্রেলিয়ার সিনেট অপেক্ষা মার্কিন সিনেট অনেক বেশি শক্তিশালী। তাই মার্কিন সিনেটকে বিশ্বের সর্বাপেক্ষা দ্বিতীয় শক্তিশালী কক্ষ হিসেবে অভিহিত করা যায়।

উপসংহারঃ উপযুক্ত আলােচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভা কংগ্রেসের উচ্চ কক্ষ সিনেট একটি শক্তিশালী কক্ষ। তাছাড়া বিভিন্ন দেশের উচ্চ কক্ষের সাথে তুলনামূলক আলােচনাতে দেখা যায় যে, সিনেট বিশ্বের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী দ্বিতীয় কক্ষ। এ কারণে Prof. C. F. Strong বলেছেন, "The powers of the senate are very great probably no second chamber in the world today has an influence so real and direct." সুতরাং সিনেটকে বিশ্বের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী দ্বিতীয় কক্ষ হিসেবে অভিহিত করা যায়।



(11) ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা


ফরাসী রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা  কার্যাবলী:

১৯৫৮ সালের পঞ্চম সাধারণতন্ত্রের সংবিধানে রাষ্ট্রপতিকে শাসনব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করা হয়েছে এবং প্রভূত ক্ষমতার অধিকারী করা হয়েছে। তৃতীয় ও চতুর্থ সাধারণতন্ত্রের সংবিধানে রাষ্ট্রপতি পদটিকে দুর্বল করে গড়ে তোলার জন্য যে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংকট দেখা দিয়েছিল তার যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেজন্য পঞ্চম সাধারণতন্ত্রের সংবিধান প্রণেতাগণ রাষ্ট্রপতির পদটিকে শক্তিশালী করে ক্যাবিনেট তথা পার্লামেন্টকে অধস্তন অবস্থায় রাখার পক্ষপাতী ছিলেন। রোডী, এ্যাণ্ডারসন ও খ্রীস্টল (Rodee, Anderson and Christol) বলেছেন : “The Constitution of 1958 gave first place to the office of the President and placed both Cabinet and Parliament in inferior positions.” বস্তুত পূর্বেকার নিয়মতান্ত্রিক শাসকের জায়গায় নতুন সংবিধানে (১৯৫৮) রাষ্ট্রপতিকে প্রকৃত শাসক হিসাবে গড়ে তোলা হয়।

ফরাসী রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও কার্যাবলীকে নিম্নলিখিত কয়েকটি ভাগে ভাগ করে আলোচনা করা হোল :

    ফরাসী রাষ্ট্রপতির শাসন সংক্রান্ত  ক্ষমতা:

    (১) শাসন সংক্রান্ত ক্ষমতা: ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি হলেন একই সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রধান এবং সরকারের প্রধান। তিনিই হলেন দেশের শাসনব্যবস্থার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। 

     রাষ্ট্রপতির অন্যান্য শাসন-সংক্রান্ত ক্ষমতাগুলি হল নিম্নরূপ :

    (ক) নিয়োগ সংক্রান্ত ক্ষমতা : রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীকে এবং প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে অন্যান্য মন্ত্রীদের নিয়োগ ও পদচ্যুত করতে পারেন। এ ছাড়া অসামরিক সরকারী পদস্থ কর্মচারী, বহির্দেশীয় অঞ্চলের সরকারী প্রতিনিধি, অ্যাকাডেমীর রেক্টর, সরকারী বিভাগের পরিচালক প্রভৃতিকে নিয়োগ করেন রাষ্ট্রপতি।

    খ) প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত ক্ষমতা : রাষ্ট্রপতি হলেন ‘সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক’ (the commander of the armed forces — Article 15)। গুরুত্বপূর্ণ সামরিক পদগুলিতে নিয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতি ভোগ করেন। এছাড়া তিনি জাতীয় প্রতিরক্ষার উচ্চতর পরিষদ ও কমিটিগুলির সভায় সভাপতিত্ব করেন।

    (গ) পররাষ্ট্র বিষয়ক ক্ষমতা: রাষ্ট্রপতি বিদেশে রাষ্ট্রদূত প্রেরণ করেন এবং বিদেশের রাষ্ট্রদূতকে গ্রহণ করে থাকেন (১৪নং ধারা)। এছাড়া বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে সন্ধির শর্তাদি আলোচনা করার এবং চুক্তি সম্পাদন করার ক্ষমতা তাঁর আছে। আন্তর্জাতিক কোন সন্ধি বা চুক্তি তাঁর মনোমত না হলে তিনি সেটিকে গণভোটে দিতে পারেন।

    ফরাসি রাষ্ট্রপতি আইন সংক্রান্ত ক্ষমতা:

    (২) আইন সংক্রান্ত ক্ষমতা : রাষ্ট্রপতির আইন সংক্রান্ত ক্ষমতাও যথেষ্ট ব্যাপক।

    (ক) বাণী প্রেরণ: সংবিধান অনুসারে রাষ্ট্রপতি পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে বাণী প্রেরণ করতে পারেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করতে পারেন। এই বাণী প্রেরণের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি পার্লামেন্টের ওপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে থাকেন।

    (খ) স্থগিতকারী ভেটো প্ৰদান : মার্কিন রাষ্ট্রপতির ন্যায় ফরাসী রাষ্ট্রপতির ভেটো প্রয়োগের ক্ষমতা নেই। এমনকি পার্লামেন্ট কর্তৃক গৃহীত বিলে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরদানের কোন প্রয়োজন হয় না। তবে তিনি যে-কোন বিলকে পুনর্বিবেচনার জন্য পার্লামেন্টের কাছে নির্দেশ পাঠাতে পারেন। সংবিধান অনুসারে পার্লামেন্ট এই নির্দেশ অমান্য করতে পারে না।

    (গ) গণভোট সংক্রান্ত ক্ষমতা: রাষ্ট্রপতি যে-কোন বিলকে জনগণের সম্মতির জন্য গণভোটে পেশ করতে পারেন। এটি পুরোপুরি রাষ্ট্রপতির স্বেচ্ছাধীন ব্যাপার ; এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর বা অন্য কারও অনুমতি নিতে হয় না।

    (ক) নিম্নকক্ষ ভেঙে দেবার ক্ষমতা : প্রধানমন্ত্রী এবং পার্লামেন্টের উভয় কক্ষের সভাপতির সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ জাতীয় সভা ভেঙে দিতে পারেন (১২নং ধারা)। পরামর্শ নেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও পরামর্শমত কাজ করা বাধ্যতামূলক নয়। অবশ্য বছরে একবারের বেশি জাতীয় সভা ভেঙে দেওয়া যায় না।

    (ঙ) আইনের বৈধতা বিচার সংক্রান্ত ক্ষমতা : রাষ্ট্রপতির অন্যতম স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা হল এই যে, তিনি মনে করলে যে-কোন সাধারণ আইনের বৈধতা বিচারের জন্য সেটিকে সাংবিধানিক পরিষদের নিকট প্রেরণ করতে পারেন।

    ফরাসি রাষ্ট্রপতি বিচার সংক্রান্ত ক্ষমতা:

    (৩) বিচার সংক্রান্ত ক্ষমতা: রাষ্ট্রপতি অপরাধীকে ক্ষমা প্রদর্শন করতে পারেন, এমনকি মৃতুদণ্ডাজ্ঞা প্রাপ্ত ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড নাকচ করতে পারেন। রাষ্ট্রপতি বিচারবিভাগীয় উচ্চতর পরিষদের (Higher Council of the Judiciary) অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং তিনি এই পরিষদে ৯ জন সদস্যকে নিয়োগ করেন।

    (8) সালিশী ক্ষমতা: 

     সংবিধানে রাষ্ট্রপতিকে মধ্যস্থতা করার বা সালিশী ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। সরকারী সংস্থাগুলি যাতে নিয়মিতভাবে কাজ করে এবং যাতে রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে তার জন্য রাষ্ট্রপতি সালিশের ভূমিকা পালন করে থাকেন।

    (৫) সংবিধান সংক্রান্ত ক্ষমতা:

      সংবিধানের ৫নং ধারায় রাষ্ট্রপতিকে ‘সংবিধানের অভিভাবক’ (the guardian of the constitution) হিসাবে কাজ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। সবাই যাতে সংবিধান মেনে কাজ করে তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব। এছাড়া সংবিধানের ৮৯নং ধারা বলে রাষ্ট্রপতি সংবিধান সংশোধনের ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন।

    ফরাসি রাষ্ট্রপতির জরুরি অবস্থা সংক্রান্ত ক্ষমতা:

    (৬) জরুরী অবস্থা সংক্রান্ত ক্ষমতা: সংবিধানের ১৬নং ধারায় রাষ্ট্রপতির হাতে জরুরী অবস্থা সংক্রান্ত ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, দেশে যদি এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয় যার ফলে জাতির স্বাধীনতা, সংহতি বিনষ্ট হতে পারে বা সাধারণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানসমূহ ও সরকারী কর্তৃপক্ষের স্বাভাবিক কাজকর্ম ভীষণভাবে বিপন্ন হয় তাহলে প্রধানমন্ত্রী, পার্লামেন্টের উভয়কক্ষের সভাপতি এবং শাসনতান্ত্রিক পরিষদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি প্রয়োজনীয় যে-কোন ব্যবস্থা অবলম্বন করতে পারেন। ১৯৬১ সালে আলজিরিয়ার সংকটের সময়ে রাষ্ট্রপতি দ্য গল (De Gaulle) এই ক্ষমতা প্রয়োগ করেছিলেন। অনেকে মনে করেন এই ক্ষমতার দ্বারা রাষ্ট্রপতি একটি আইনসঙ্গত একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারেন (a legal dictatorship could be established — J. Blondel)।

    (12) ফ্রান্স এর সংবিধানের বৈশিষ্ট


    মন্তব্যসমূহ

    এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

    Tasnim Jahan Miss (English Exam Topic)

    Fazlul Haque Polash Sir Exame Topic