Fazlul Haque Polash Sir Exame Topic
(Q:1) রাষ্ট্র বিজ্ঞান পাঠের প্রয়োজনীয়তা / Necessity and Importance off the study of Political Science.
Answer:
(Q:2) রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অর্থ ও সংজ্ঞা / Meaning of Political Science.
Answer:
Answer:
ভূমিকা
মানুষ সামাজিক জীব। এ উক্তি গ্রীক্ পণ্ডিত এ্যারিস্টটলের। তিনি বলেছেন: 'মানুষ মাত্রেই রাষ্ট্রীয় জীব। যারা রাষ্ট্রীয় আওতার বাইরে তাদের স্থান মানবসমাজের উপরে বা নীচে।' মনীষী বেকনও অনুরূপভাবে বলেছেন যে, 'নির্জনতা যারা কামনা করে, তারা হয় দেবতা না হয় পশু।' বস্তুতঃ মানুষের ধর্মই হল সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করা। আবার মানবজীবন ও মানবসমাজ গতিশীল। এর বিবর্তন ঘটেছে এবং ঘটবে। তবে মানুষ ও তার সমাজ সম্পর্কে সারকথা হল এই যে, পারস্পরিক নির্ভরশীলতার কারণে মানুষ কতকগুলি নিয়ম-কানুন মেনে চলতে বাধ্য। এই সমস্ত নিয়ম-কানুনের এক বিশেষ উন্নত প্রকাশ হল রাষ্ট্রীয় সংগঠন ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাদি। কালের নিয়মে মানবসমাজ ও সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে। সঙ্গে সঙ্গে মানুষ এক বিশেষ ধরনের সুনিয়ন্ত্রিত সমাজব্যবস্থার মধ্যে বসবাস করতে শুরু করেছে। এই সমাজব্যবস্থায় মানুষ বিশেষভাবে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। এই সুনিয়ন্ত্রিত সমাজব্যবস্থার পোষাকী নাম হল রাষ্ট্র।
সমাজজীবন বিশ্লেষণের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসাবে রাজনীতিক বিশ্লেষণ তথা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের উৎপত্তি। রাষ্ট্রের অন্যতম অঙ্গ হিসাবে নাগরিকের রাজনীতিক অস্তিত্ব বর্তমান। নাগরিকের এই রাজনীতিক অস্তিত্বের পরিচয় পাওয়া যায় রাষ্ট্রবিজ্ঞানে। মানুষের সঙ্ঘবদ্ধ জীবনের চরম অভিব্যক্তি হল রাষ্ট্রশক্তি ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা। সাম্প্রতিককালে রাষ্ট্রশক্তির বিস্তার সমাজের সর্বক্ষেত্রে। বর্তমানে রাষ্ট্র-ব্যবস্থার প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা অন্য যে-কোন সামাজিক বিধি-ব্যবস্থার থেকে ব্যাপক ও কার্যকরী। এই কারণে এই চরম শক্তিশালী ব্যবস্থার গতি-প্রকৃতি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা ও আলোচনা-বিতর্কের শেষ নেই।
সমাজজীবনের ভিত্তিতেই মানুষের চিন্তার ইতিহাসের সৃষ্টি হয়। মানুষের সমাজজীবনই চিন্তার রসদ জোগায়। রাষ্ট্রচিন্তার ক্ষেত্রেও এ কথা সমভাবে প্রযোজ্য। মানুষের রাষ্ট্রচিন্তা বা রাজনীতিক তত্ত্বের বিকাশ ঘটে মানুষের সামাজিক জীবন প্রবাহের পরিপ্রেক্ষিতে। মানুষের সামাজিক জীবনধারার বাইরে থেকে রাষ্ট্রচিন্তার কথা ভাবা যায় না। প্রকৃত প্রস্তাবে মানবসমাজের এক ব্যাপক প্রেক্ষাপটে রাজনীতিক তত্ত্ব ও রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাস পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এই ব্যাপক দৃষ্টিকোণ ব্যতিরেকে রাজনীতিক তত্ত্ব ও রাষ্ট্রচিন্তার যথাযথ বিচার-বিশ্লেষণ এবং সম্যক অনুধাবন দুরূহ ব্যাপার। সামাজিক জীবনের প্রাসঙ্গিকতা রহিত রাজনীতিক তত্ত্ব হল বিমূর্ত ও অবাস্তব। কি ধরনের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি এবং ঐতিহাসিক অবস্থায় কোন একটি রাজনীতিক তত্ত্বের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে তা বিচার-বিবেচনা করা দরকার। এ হল এক ইতিহাস-চেতনা। এই চেতনার আলোকে চিন্তা ও তত্ত্বকে বাস্তব জগতের তথ্যাদির পরিপ্রেক্ষিতে পর্যালোচনা করা যায়। প্রগাঢ় ইতিহাস-চেতনা বিমূর্ত তাত্ত্বিক অবস্থার সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করে এবং রাষ্ট্রচিন্তা ও রাজনীতিক তত্ত্বের বিকাশকে বুদ্ধিগ্রাহ্য করে তোলে।
রাষ্ট্রচিন্তার জগতে দ্বন্দ্বের অস্তিত্ব অনিবার্য। বিষয়টি ব্যাখ্যা করা দরকার। রাজনীতিক তাত্ত্বিকদের চিত্তার বিন্যাস তাঁদের সামাজিক অবস্থানের উপর নির্ভরশীল। রাষ্ট্র-দার্শনিকরাও সমাজের সদস্য। তাঁরা সমাজের সদস্য হিসাবে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন সামাজিক অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে তাত্ত্বিক রূপ দিয়ে তা প্রকাশ করেন। রাষ্ট্র-দার্শনিকদের সামাজিক অবস্থান ও অভিজ্ঞতার মধ্যে তারতম্য থাকে। তারফলে স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের চিন্তা-চেতনার জগতে তারতম্যের সৃষ্টি হয়। রাজনীতিক তাত্ত্বিকদের সামাজিক চেতনা তাঁদের সামাজিক অবস্থানের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। তাঁদের চিন্তা-চেতনা সমাজজীবনেরই ফসল। এইভাবে সামাজিক অবস্থানের ক্ষেত্রে বৈপরীত্য সামাজিক চেতনার ক্ষেত্রে বৈপরীত্যের সৃষ্টি করে। তারফলে রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তার জগতে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সৃষ্টি হয়। এবং এর পরিণতি হিসাবে রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাস ক্রমান্বয়ে সমৃদ্ধ হতে থাকে।
বিভিন্ন চিন্তাবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নিজের পরিবেশ-পরিমণ্ডল ও দৃষ্টিভঙ্গী অনুসারে রাজনীতিক মতবাদ, ভাবাদর্শ, মানুষের রাজনীতিক জীবন এবং বিভিন্ন রাজনীতিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। ভারতবর্ষে ভীষ্মদেবের রাজনীতিক উপদেশ থেকে শুরু করে মানবেন্দ্রনাথ রায় ও পণ্ডিত নেহেরুর চিন্তা ভাবনা পর্যন্ত এবং পশ্চিমের সোফিস্ট পণ্ডিতবর্গ থেকে শুরু করে ল্যাস্কি, লাসওয়েল, ইস্টন প্রমুখ আধুনিক লেখকগণ পর্যন্ত অসংখ্য মনীষীর মনীষায় রাজনীতিক বিচার-বিশ্লেষণ সমৃদ্ধ। তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মাত্রেই তাঁর পরিবেশের প্রভাবকে কাটিয়ে উঠতে পারেননি। রাষ্ট্রদার্শনিকদের সামাজিক অবস্থানই তাঁদের চিন্তা চেতনার মূল উৎস হিসাবে কাজ করে থাকে। সমাজবিকাশের যে স্তরে একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অবস্থান করেন সমাজজীবনের অন্যতম অংশীদার হিসাবে এবং তার ভিত্তিতেই তিনি তাঁর মতামত গঠন করেন ও ব্যক্ত করেন। আবার নির্দিষ্ট একটি সমাজব্যবস্থায় চিন্তাবিদদের সামাজিক অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য থাকে। তারফলেও তাঁদের উদ্দেশ্য, লক্ষ্য এবং বিচার-বিশ্লেষণের মধ্যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। মানব সমাজের রাজনীতিক জীবনের বিচার-বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র-দার্শনিকরা তাঁদের নিজেদের সামাজিক অবস্থান ও অভিজ্ঞতার দ্বারা প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকেন। অর্থাৎ তাঁদের সমাজজীবনের অভিজ্ঞতা এবং আনুষঙ্গিক দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রকাশ ঘটে তাঁদের মতামত ও আলোচনার মাধ্যমে। এই কারণে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রকৃতি ও পরিধি সম্পর্কে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মধ্যে ব্যাপক মতপার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনায় ঐকমত্য সুদূরপরাহত। আলোচ্য শাস্ত্রের স্বরূপ ও সীমানা সম্পর্কে সর্বজনস্বীকৃত সিদ্ধান্ত আশাতীত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনায় অসংখ্য অভিমত ও তত্ত্বের জটিল বিন্যাস বর্তমান। তবে সকল রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর উপর পরিবেশ পরিমণ্ডলের প্রভাব সমান নয়। এতদ্সত্ত্বেও রাষ্ট্র-দার্শনিকদের সামাজিক অবস্থান বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ
বস্তুত রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনার প্রেক্ষাপটেই সমাজজীবনের প্রকৃত মূল্য অনুধাবন করা যায়। মানুষের রাষ্ট্রনীতিক জীবনের এই গুরুত্বের কারণেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। তবে সমাজজীবন যেমন বিবর্তিত হয়েছে তেমনি রাষ্ট্র-ব্যবস্থা ও রাজনীতিক ক্রিয়াকলাপেরও পরিবর্তন ঘটেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা ও বিষয়বস্তু প্লেটো-অ্যারিস্টটলের চিন্তাচেতনায় সমৃদ্ধ। সুদীর্ঘ কয়েক শতাব্দী ধরে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে প্লেটো-অ্যারিস্টটলের ধারা অনুসৃত হয়েছে। পরবর্তীকালে এই ধারার পরিবর্তন ঘটেছে। তাই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মূল উপজীব্য বিষয় হল পরিবর্তনশীল রাষ্ট্র-ব্যবস্থা, শাসনতন্ত্র ও রাজনীতিক ক্রিয়াকলাপের ধারা ও ধারণার বিচার-বিশ্লেষণ। আবার একথাও অস্বীকার করা যাবে না যে, রাষ্ট্র-ব্যবস্থা ও রাজনীতির প্রশ্নটি সমাজবদ্ধ মানুষের জীবনধারার সকল স্তরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। এই কারণে রবার্ট ডাল (Robert Dahi) বলেছেন: “Politics is one of the unavoidable facts of human existence. Everyone is involved in some fashion at some time in some kind of political system."
প্রকৃত প্রস্তাবে সমাজজীবন বিশ্লেষণের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসাবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের উৎপত্তি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মাধ্যমেই মানব সমাজের রাজনীতিক বিচার-বিশ্লেষণের সূত্রপাত ঘটে। মানুষের সঙ্ঘবদ্ধ জীবনের চরম অভিব্যক্তি হল রাষ্ট্রশক্তি এবং রাষ্ট্র-ব্যবস্থা। বর্তমানে রাষ্ট্রশক্তির বিস্তার সমাজের সর্বস্তরে। রাষ্ট্র-ব্যবস্থার প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা অন্য যে-কোন সামাজিক বিধি-ব্যবস্থার থেকে অধিক ও কার্যকরী। এই চরম শক্তিশালী ব্যবস্থার গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে চিন্তা, বিচার-বিশ্লেষণ ও বিতর্কের শেষ নেই।
সমাজজীবনের আবশ্যিকতা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু প্রত্যেক মানুষই এক অর্থে আত্মকেন্দ্রিক। আত্মচিন্তা ও আত্মরক্ষার মৌলিক প্রবণতা কম-বেশী সকলের মধ্যেই বর্তমান। মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের সবটাই নিখাদ সহযোগিতার সম্পর্ক নয়। সহযোগিতার সঙ্গে সঙ্গে দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতার সম্পর্কও মানবসমাজে দেখা যায়। ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে, ব্যক্তিতে-গোষ্ঠীতে এবং গোষ্ঠীতে-গোষ্ঠীতে অবিরাম দ্বন্দ্ব সংঘাত মানব-ইতিহাসের বৈশিষ্ট্য। এই দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিয়ন্ত্রণের জন্য মানুষ সমাজজীবনে বিভিন্ন বিধি ব্যবস্থা একের পর এক সৃষ্টি করেছে। তার মধ্যে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও আইন-কানুনের বিস্তারই হল সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্র দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিয়ন্ত্রণের সর্বোৎকৃষ্ট ও চূড়ান্ত ব্যবস্থা।
সাধারণভাবে বিজ্ঞান বলতে এক সুসংবদ্ধ বিশেষ জ্ঞানকে বােঝায়। 'রাষ্ট্রবিজ্ঞান' শব্দটির মধ্যে 'বিজ্ঞান' শব্দটি থাকায় অনেকদিন আগেই একটি বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মধ্যেও এই নিয়ে সংশয় ও মতবিরােধ রয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে বিজ্ঞান বলা যায় কি না, তার পক্ষে ও বিপক্ষে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা যে মতামত প্রকাশ করেছেন, তা নীচে আলােচনা করা হল一
রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে বিজ্ঞান বলার পক্ষে যুক্তি
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিজ্ঞান কি না সে বিষয়ে মতামত দিতে গেলে বিজ্ঞান বলতে কী বােঝায়, সে সম্পর্কে জ্ঞান থাকা দরকার। বিজ্ঞান হল কোনাে বিষয়ে সুসংবদ্ধ ও সুশৃঙ্খল জ্ঞান, যা পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণের মাধ্যমে লাভ করা যায়।
[1] সুসংবদ্ধ জ্ঞান: যে-কোনাে সুসংবদ্ধ জ্ঞানকে বিজ্ঞান আখ্যা দেওয়া হলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানও একটি বিজ্ঞান। রাষ্ট্রবিজ্ঞানেও পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষপ, শ্রেণি বিভক্তিকরণ, কার্যকারণ সম্পর্ক নির্ণয়ের মধ্য দিয়ে নাগরিকদের আচার-আচরণ, রাষ্ট্রের উৎপত্তি ও প্রকৃতি প্রভৃতি সম্পর্কে সুসংবদ্ধ জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব।
[2] পর্যবেক্ষণ সম্ভব: রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনার সূত্রপাত করেছিলেন প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো ও অ্যারিস্টটল। সেই সময় থেকেই রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে পর্যবেক্ষণ শুরু হয়, যা আজও চলছে। যেমন, মতেস্কুর ক্ষমতাম্বন্ত্রীকরণ নীতি, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার শ্রেষ্ঠত্ব ইত্যাদি বিষয়গুলি পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতার ফল।
[3] পরীক্ষণ সম্ভব: রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রধান আলােচ্য বিষয় হল মানুষ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ মানুষকে নিয়েই নিরন্তর পরীক্ষানিরীক্ষা করে চলেছেন। এই পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ আদর্শ ও জনকল্যাণকর রাষ্ট্রের ছবি তুলে ধরেছেন।
[4] সাধারণ সূত্র প্রতিষ্ঠা: বিজ্ঞানের মতাে রাষ্ট্রবিজ্ঞানেও আহরিত জ্ঞান থেকে একটি সাধারণ সূত্র প্রতিষ্ঠা করা যায়। সেই সূত্র অনেক সময়ই রাজনৈতিক সমস্যাসমাধানের পথ নির্দেশ করার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়।
[5] সর্বজনীন বিধি প্রণয়ন: অ্যারিস্টটল, ফাইনার, বােদা, ব্রাইস প্রমুখ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক জীবন পর্যালােচনা করে। কয়েকটি সর্বজনীন বিধি ও পদ্ধতি প্রণয়নে প্রয়াসী হয়েছিলেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কোনাে নির্দিষ্ট গবেষণাগার না থাকলেও বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক জীবনের বিবর্তন, উত্থানপতনের ইতিবৃত্ত, রাজনৈতিক কাঠামাের পরিবর্তন ইত্যাদির গবেষণা সর্বজনীন বিধি প্রণয়নে সাহায্য করে।
[6] তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণ: রাষ্ট্রবিজ্ঞানে শুধু তত্ত্বের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয় না, বিজ্ঞানের মতাে রাষ্ট্রবিজ্ঞানেও তথ্যের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্তে পোঁছােতে হয়। মানব ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ের তথ্যগুলি বিশ্লেষণের মাধ্যমে মার্কস ও এঙ্গে সমাজবিকাশের ধারার বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন।
[7] মূল্যমান-নিরপেক্ষ আলােচনা: আধুনিক কালের আচরণবাদী রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা গণিত ও পরিসংখ্যানের মাধ্যমে প্রয়ােজনীয় তথ্যাদি সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মূল্যমান-নিরপেক্ষ আলােচনা গড়ে তােলেন। এইভাবে তাঁরা ভৌতবিজ্ঞানের মতাে রাষ্ট্রবিজ্ঞানেও একটি বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি রূপায়ণে সচেষ্ট হন।
[8] ভবিষ্যদ্বাণী সম্ভব: রাষ্ট্রবিজ্ঞানেও পদার্থবিদ্যা বা রসায়নবিদ্যার মতাে ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব। যেমন, বর্তমানে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনের আগেই জনমত সমীক্ষার মাধ্যমে নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়। এই ভবিষ্যদ্বাণী পুরােপুরি না মিললেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মিলে যায়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে বিজ্ঞান বলার বিপক্ষে যুক্তি
[1] অনিশ্চিত প্রকৃতিবিশিষ্ট: রাষ্ট্রবিজ্ঞান যেসব বিষয় নিয়ে আলােচনা করে তাদের প্রকৃতি অনিশ্চিত, জটিল ও পরিবর্তনশীল। পদার্থবিদ্যা বা রসায়নশাস্ত্রের মতাে এখানে নিখুঁত পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ ও তত্ত্ব গঠন সম্ভব নয়।
[2] গবেষণাগারে পরীক্ষার অযােগ্য: রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলােচিত বিষয়গুলি কোনাে নির্দিষ্ট গবেষণাগারে পরীক্ষা করা যায় না। প্রকৃতপক্ষে সমগ্র মানবসমাজই হল রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর গবেষণাগার। এই গবেষণাগার রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর ইচ্ছা অনুসারে নির্মিত হয় না। একজন ভৌতবিজ্ঞানী গবেষণাগারে যেভাবে গবেষণার অনুকূল পরিবেশ কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করতে পারেন, একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর পক্ষে তা সম্ভব নয়।
[3] তথ্য অপেক্ষা তত্ত্বের প্রাধান্য: বিজ্ঞানীরা যেভাবে তত্ত্ব ও তথ্যের ওপর সমান গুরুত্ব দিয়ে বৈজ্ঞানিক অনুশীলন করে থাকেন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানে তা দেখা যায় না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে তথ্যের চেয়ে তত্ত্ব বেশি প্রাধান্য পায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বৈজ্ঞানিক অনুশীলনের পরিবর্তে দার্শনিক চিন্তার ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।
[4] সর্বসম্মত পদ্ধতির অনুপস্থিতি: বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার মতাে সর্বসম্মত পদ্ধতি বলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে কিছু দেখা যায় না। তাই রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করে থাকেন।
[5] মূল্যমান-নিরপেক্ষ নয়: রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলােচনাকে কখনও ভৌতবিজ্ঞানের মতাে সম্পূর্ণ মূল্যমান-নিরপেক্ষ করে গড়ে তোলা যায় না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর এইপ্রকার গবেষণাসমূহ তাঁর রাজনৈতিক মূল্যবোধ ও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের দ্বারা প্রভাবিত হয়।
[6] সংখ্যায়নের প্রয়ােগ অফলপ্রসূ: ভৌতবিজ্ঞানের গবেষণায় যেভাবে সংখ্যায়নের (Quantification) সাহায্যে গবেষণার ফলাফলকে প্রকাশ করা যায়, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তা অসম্ভব। সংখ্যায়নের সাহায্যে মানুষের রাজনৈতিক আচরণের যথার্থ স্বরূপ উদঘাটন কোনােভাবেই সম্ভব নয়।
[7] সর্বজনীনতার অভাব: ভৌতবিজ্ঞানের পরীক্ষিত ফলাফলগুলি যে-কোনাে দেশেই প্রয়ােগ করা যায়, যার ফলে একটা সর্বজনীনতা দেখা যায়। অন্যদিকে, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে গবেষণার ফলাফল সব দেশে সার্বিকভাবে প্রয়ােগ করা যায় না।
[8] সূত্রের প্রতিষ্ঠা অসম্ভব: রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মৌল আলােচ্য বিষয় হল, মানুষের রাজনৈতিক আচার-আচরণ। রাজনৈতিক আচার-আচরণের সঙ্গে জড়িত মানুষের অনুভূতি ও আবেগ বহু ধরনের উপাদানের দ্বারা প্রভাবিত হয়। এজন্য ভৌতবিজ্ঞানের মতো কোনাে সাধারণ নিয়ম বা সূত্র রাষ্ট্রবিজ্ঞানে গড়ে তােলা যায় না৷
[9] ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনা-নিরপেক্ষ: রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পৃথকভাবে ব্যক্তির নিজস্ব চিন্তাভাবনা, কাজকর্ম ইত্যাদিকে ফলিত গবেষণার অন্তর্ভুক্ত করা যায় না| মরিস কর্নফোর্থের মতে, কোনাে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে যেমন ব্যক্তিমানুষের সামাজিক সম্পর্ককে পরীক্ষা করা যায় না, ঠিক তেমনই কোনাে রাসায়নিক পদার্থের সাহায্যে তার প্রকৃতিকে আবিষ্কার করাও সম্ভবপর নয়।
উপসংহার: পরিশেষে উল্লেখ্য, রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে পদার্থবিদ্যা বা গণিতশাস্ত্রের মতাে বিশুদ্ধ বিজ্ঞান বলা না গেলেও এটি যে একটি সুসংহত সামাজিক বিজ্ঞান, তা নিয়ে কোনাে দ্বিমত নেই। লর্ড ব্রাইসের মতে, রাষ্ট্রবিজ্ঞান হল একটি প্রগতিশীল বিজ্ঞান (Political science is a progressive science.)।
Source: https://www.millioncontent.com/2021/02/blog-post_17.html
(5)রাষ্ট্রের উৎপত্তি সংক্রান্ত মতবাদ অথবা তত্ত্ব
https://www.ebookbou.edu.bd/Books/Text/OS/SSC/ssc_2606/Unit-05.pdf
সূচনাঃ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় সার্বভৌমত্ব হলো রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং শৃঙ্খলা রক্ষায় চূড়ান্ত তত্ত্বাবধায়ক বা কর্তৃত্ব স্থাপনের একটি পক্রিয়া। সার্বভৌমত্বের ধারণা মতে রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক আইনের সবচেয়ে বিতর্কিত ধারণাগুলোর মধ্যে একটি হল সার্বভৌমত্ব । এটি রাষ্ট্র ও সরকার এবং স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
সার্বভৌমত্বঃ কোনো রাষ্ট্র যে ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের উপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং অন্য রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ও হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থাকতে পারে, তাকে সার্বভৌমত্ত্ব বলে।
“Sovereignty” এর বাংলা প্রতিশব্দ হলো ‘ সার্বভৌমত্ব‘ । যা ল্যাটিন শব্দ Superanus এবং “Sovrano” থেকে এসেছে। এ দুটি ল্যাটিন শব্দের মৌলিক অর্থ হলো “Supreme”
সার্বভৌম রাষ্ট্রঃ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হল একটি কেন্দ্রীয় সরকার এর দ্বারা শাসিত এবং যার একটি নির্দিষ্ট ভূখন্ডে সার্বভৌমত্ব বিদ্যমান। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, একটি স্থায়ী জনগোষ্ঠীর নির্দিষ্ট সীমানা এবং সরকার ব্যবস্থা এবং অপর প্রান্তিক কোন সার্বভৌম রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের করা যোগ্যতা থাকলে তাকে সার্বভৌম রাষ্ট্র বলা হয়।
উপসংহারঃ সাধারণ অর্থে, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র অন্য কোন রাষ্ট্রের শক্তি বা রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল বা অন্য রাষ্ট্র দ্বারা প্রভাবিত নয়। একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র কোনো পরিচালনা পরিষদের বাইরের কোনো সংগঠনের হস্তক্ষেপ ছাড়া কাজ করার পূর্ণ অধিকার ও ক্ষমতা রাখে।
https://www.ebookbou.edu.bd/Books/Text/OS/HSC/hsc_1804/Unit-10.pdf
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন